গৃহস্থালি থেকে বড় ব্যবসায়ী পর্যন্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে অতিপ্রত্যাশিত সুদহার কমানোর নতুন চক্র শুরু করেছে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ (ফেড)। ঋণ বাবদ খরচ কমার এ প্রক্রিয়া বিদেশী বিনিয়োগকারীদেরও প্রভাবিত করছে। এতে ডলারে বিনিয়োগের ঝুঁকি হ্রাসমূলক হেজিং খরচ কমতে পারে। সম্ভাবনাটি সামনে রেখে বিশ্লেষকরা বলছেন, মার্কিন সম্পদকে ভবিষ্যতে মুদ্রার বিনিময় হারজনিত দুর্বলতা থেকে রক্ষা করতে হেজিং প্রবণতা বাড়াতে পারেন বিদেশী বিনিয়োগকারীরা। খবর রয়টার্স।
আর্থিক বাজারে হেজিং হলো বিদ্যমান পোর্টফোলিওর ক্ষতি সীমিত রাখার একটি পদ্ধতি। এর মাধ্যমে ডেরিভেটিভসের মতো কৌশলের মাধ্যমে মুদ্রার বিনিময় হারের বিপরীত অবস্থান তৈরি করা হয়। ফেড সুদহার কমানো শুরু করায় বিদেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য ডলার হেজিং সস্তা হচ্ছে ও ডলারের অবমূল্যায়ন হচ্ছে। তাই বিনিয়োগকারীরা মার্কিন সম্পদকে রক্ষা করার জন্য হেজিং বাড়াতে পারেন। তবে হেজিং প্রায়ই ফরওয়ার্ড বা সোয়াপের মাধ্যমে ডলার বিক্রির সঙ্গে যুক্ত, তাই এ কার্যক্রম বৃদ্ধি ডলারের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলেও মন্তব্য করেছেন বিশ্লেষকরা।
শ্রমবাজারে বেকারত্ব বৃদ্ধির উদ্বেগের মাঝে গত মাসে ২৫ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে সুদহার ৪ থেকে ৪ দশমিক ২৫ শতাংশ করেছে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক। একই সঙ্গে বছরের বাকি সময় আরো সুদহার কর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে ফেড।
সুদহার কর্তন যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য উন্নত দেশের মধ্যে ঋণ বাবদ খরচের পার্থক্য কমিয়ে দিয়েছে। এতে বিদেশী পেনশন ফান্ড, সার্বভৌম সম্পদ তহবিল ও অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হেজিং খরচ কমছে। আইসিই মার্কিন ডলার সূচক চলতি বছর প্রায় ১০ শতাংশ নেমেছে। এর অন্যতম কারণ হলো মার্কিন বাণিজ্য ও শুল্কনীতির প্রভাব নিয়ে উদ্বেগের মাঝে হেজিং কার্যক্রম বাড়াচ্ছেন বিদেশী বিনিয়োগকারীরা।
বিনিয়োগ বিষয়ে পরামর্শক সংস্থা রাশেল ইনভেস্টমেন্টসের লন্ডনের ফিক্সড ইনকাম অ্যান্ড ফরেন এক্সচেঞ্জ বিভাগের প্রধান ভ্যান লু বলেন, ‘কিছু বিনিয়োগকারী ফেডের সুদহার কমানোর শুরুর দিকে নজর রাখছিল। এখন তারা ডলার ঝুঁকি কমানোর জন্য হেজিং বাড়াতে চাইছেন এবং সঠিক সময়ের অপেক্ষায় আছেন।’
ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল সেটলমেন্টসের (বিআইএস) জুনের প্রতিবেদন অনুসারে গত কয়েক বছরে উচ্চ হেজিং খরচ ও ডলারের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব ফরেন এক্সচেঞ্জ হেজিং অনুপাতকে নিম্নমুখী রেখেছে। দীর্ঘ সময় ধরে ডলারের শক্তিশালী অবস্থার কারণে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা মার্কিন সম্পদ হেজ না করেই রাখতে পেরেছেন, কারণ এটি তাদের মোট রিটার্ন বাড়িয়ে দিয়েছে এবং ঝুঁকি ভাগ করে নেয়ার একটি উৎস ছিল। এখন সে পরিস্থিতি বদলাচ্ছে।
চলতি বছর ডলারের বিনিময় হারে উল্লেখযোগ্য অবমূল্যায়ন হয়েছে এবং আরো দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। মুদ্রা বিনিময় হারের এ ক্ষতিকর ওঠানামা থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করতে পারে হেজিং, এমনটাই ভাবছেন বিদেশী বিনিয়োগকারীরা।
আর্থিক বাজারগুলো চলতি বছরের বাকি সময় প্রায় দুবার ২৫ বেসিস পয়েন্ট সুদহার কমানোর সম্ভাবনা দেখছে। যারা তাদের হেজ বাড়াতে চায় কিন্তু খরচের কারণে পিছিয়ে ছিল, এমন বিনিয়োগকারীদের জন্য এটি উৎসাহজনক হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্লেষকরা।
মরগান স্ট্যানলির তথ্যানুযায়ী বর্তমানে মার্কিন শেয়ার ও বন্ডে ৩০ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ রয়েছে বিদেশীদের, যার মধ্যে ইউরোপীয় বিনিয়োগকারীদের অংশ প্রায় ৮ ট্রিলিয়ন ডলার।
মার্কিন শেয়ারবাজারে বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা গেলেও ফেডের নেতৃত্ব, মুদ্রানীতি প্রণয়নে স্বাধীনতা ও মার্কিন নীতি নিয়ে অনিশ্চয়তা বাজারে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এর চাপ পড়েছে ডলারের ওপর। অথচ চলতি বছর এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক রেকর্ড উচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি প্রায় ১৪ শতাংশ বেড়েছে।
পরামর্শক সংস্থা কনভেরার মার্কেট ইনসাইট বিভাগের প্রধান স্টিভ ডুলি বলেন, ‘একই সময় মার্কিন শেয়ারবাজারের শক্তিশালী উত্থান ও ডলারের তীব্র পতন অস্বাভাবিক হলেও এ ধরনের প্রবণতা একদমই নতুন নয়। আমরা মনে করি, এমন বিপরীত প্রবণতার অন্যতম কারণ হেজিংয়ের বৃদ্ধি।’
জুলাইয়ের এক গবেষণায় ডয়চে ব্যাংক বলেছে, জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার ইকুইটি বিনিয়োগকারীরা বছরের শুরুতে ২০-৩০ শতাংশে থাকলেও তাদের হেজিং অনুপাত ৬০-৭০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছে।
ড্যানিশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলেছে, বীমা কোম্পানি ও পেনশন ফান্ড তাদের ডলার বিনিয়োগের তিন-চতুর্থাংশের বেশি মুদ্রা ঝুঁকি থেকে রক্ষার চেষ্টা করছে। ডয়চে ব্যাংক জানিয়েছে, কিছু বিখ্যাত পেনশন ফান্ড গ্রীষ্মের পর হেজিং অনুপাত আরো বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে।
পরামর্শক সংস্থা ম্যাকুয়ারির গ্লোবাল এফএক্স অ্যান্ড রেটস স্ট্র্যাটেজিস্ট থিয়েরি উইজম্যান বলেন, ‘আমার মনে হয়, বিদেশী বিনিয়োগকারীরা এখনো তাদের ডলার এক্সপোজার হেজ করতে আগ্রহী। তাই তারা কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আবার হেজিং কার্যক্রম শুরু করবে।’
মিলটেকএফএক্সের গবেষণা অনুসারে ইউরোপের ৮৬ শতাংশ করপোরেট সংস্থা এখন তাদের পূর্বানুমানযোগ্য মুদ্রা ঝুঁকি হেজ করছে, যা ২০২৩ সালে ছিল ৬৭ শতাংশ। তাদের গড় হেজ অনুপাত ৪৩ শতাংশ বেড়ে ৪৯ শতাংশ হয়েছে।
অবশ্য বিনিয়োগ মনোভাব শুধুই সুদহার কর্তননির্ভর নয়, এমনটা বলছেন মেসিরো কারেন্সি ম্যানেজমেন্টের প্রধান জোসেফ হফম্যান। এর সঙ্গে অন্য কিছু পদক্ষেপও যুক্ত। সুদহার কর্তনের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে ফেড নীতি, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ধারাবাহিক বাজেট ঘাটতির কারণে ডলারের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দীর্ঘমেয়াদি হচ্ছে।